“তুবা ও সিয়াম-দের কষ্টগুলোর অচিরেই অবসান হোক।”
—– ডঃ এম. এস. কবীর জুয়েল।

গুজবের জনরোষে সদ্য মা হারানো সাড়ে চার বছরের অবুঝ খুকিটি এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, সে কি হারিয়েছে, তার ধারণা মা তাসলিমা বেগম রেণু কোথাও কিছুক্ষণ বা কিছুদিনের জন্য গিয়েছে, আবার তো চলে আসবে…
আসুন তুলনামূলক আলোচনা করা যাক–
নীচের সারিতে রেণু-র ছবির পাশের ছেলেটি(ছবি অনুমতিক্রমে প্রকাশিত) আজ চেম্বারে এসছে ওর বাবার সাথে, কারন অভাবের সংসারে সচ্ছলতা আনতে তার মা সংসারের কাউকে না জানিয়ে হঠাৎ সৌদি চলে গেছে, কফিল(সৌদি গৃহকর্তা)-এর অসহযোগীতার কারণে তারা কোনভাবেই মায়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেনা, ওসব দেশে যাবার পর আমাদের দেশের অধিকাংশ মহিলাগুলোই ওদের ইচ্ছের পুতুল হয়ে যায়। ওখানে চাকুরীকালীন সময়ে আমি প্রায়শ:ই গরীব দেশ(বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ইথিওপীয়া, সোমালিয়া ইত্যাদি) গুলোর খাদ্দামা(গৃহকর্মী)দের নানারুপী মানসিক উপসর্গ নিয়ে আইয়াদা নাফসিয়া(মানসিক বহি:বিভাগ)-তে আসতে দেখতাম, আমি বিশেষজ্ঞ হওয়াতে রেফার্ড না হলে আমার দেখবার অনুমতি ছিলোনা, তবে আমার অনুরোধে আমাদের সিরিয়ান আউটডোর রেসিডেন্ট ডা.ফুয়াদ বাংলাদেশী পেলেই আমার নিকট পাঠাতো, হরেক রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের, সীমাবদ্ধতা সত্তেও আমি সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করতাম। সমস্যাগুলোর মাঝে অন্যতম থাকতো পরিবারের সাথে যোগাযোহীন অবস্থায় সপ্তাহ – মাস পেরিয়ে যাওয়া, যা আমাদের অভিবাসী মহিলাদের মাঝে নানারকম মনোদৈহিক সমস্যা সৃষ্টি করতো, পক্ষান্তরে দেশে রেখে যাওয়া সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা অজানা আশংকায় দিন কাটাতে থাকে। গাজীপুর নিবাসী সিয়াম নামের এই যুবকের মাঝেও সেই ধরনের উদ্দেগ ও উৎকন্ঠাজনিত সমস্যার তীব্রতা দেখা দিয়েছে যা রীতিমতো সাইকোসিস বা গুরুতর মানসিক উপসর্গের পর্যায়ে চলে যায়, অথচ ছেলেটি কিশোর ও কলেজ পড়ুয়া।

এখন ভেবে দেখুন নগরীর উত্তর বাড্ডায় পদ্মাসেতু কেন্দ্রিক ভিত্তিহীন গুজবের নির্মম শিকারে মা হারানো এই শিশু তুবা-র মাঝে কি কি মনোদৈহিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে? যখন সে বুঝে ফেলবে, আমেরিকায় অভিবাসন প্রত্যাশী তার মাকে মেরে ফেলা হয়েছিলো তার-ই স্কুলসম্মুখে, তার মা বার বার বলছিলো যে সে তার নিজ মেয়ের জন্য ভর্তিফর্ম নিতে এসছে, তবুও গুজবজাত বীরগুলো বর্বর ভাবে রেণু বেগমকে মেরে ফেলেছিলো।
আমরা জানি মামলাজটে আমাদের বিচারে কিছুটা দীর্ঘসূএিতা আছে, তাৎক্ষনিক অপরাধী সনাক্তকরণে আমাদের সীমাবদ্ধতা(Inadequate CC TV Coverage on Roads & School Premises) ও কিছু ত্রুটি আছে, তবুও সব ছাপিয়ে আমাদের আইনের ওপরেই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, এভাবে আইন হাতে তুলে নেয়া কোন সভ্য জাতির পরিচায়ক হতে পারেনা। সব গুজবের একদিন আবসান হবে, স্কুলের সব মেয়ে বাচ্চাগুলো ধীরে ধীরে কিশোরীতে পরিণত হবে, ওরা প্রাণবন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে স্কুল চত্ত্বরে আনন্দ ফুর্তিতে মেতে উঠবে, হয়তো স্কুলের উচ্ছল কিশোরীগুলো পদ্মাসেতু পার হয়ে একদিন দক্ষিনাঞ্চলে পিকনিকের উদ্দেশ্যেও রওয়না দেবে, কিন্তু তুবা নামের এই শিশুটির কৈশোরে কেবলই ঔ বিদ্যালয় সম্মুখে গেলে উক্ত দিনের কথা মনে পড়বে, পিকনিকে যাবার প্রাক্কালে পদ্মার স্বচ্ছ জলে মায়ের মুখচ্ছবি ভেসে উঠবে, ইহা অনেকটা অপ্রত্যাশিত ও অপ্রতিরোধ্য; ওর মাঝে স্বাভাবিকতা আসতে বহু সময় লেগে যাবে; এমনকি ঔ স্থানে না গেলেও এমন লোমহর্ষক ঘটনা শুনলে বা দেখলে সে
অধিকতর সংবেদনশীল হয়ে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়বে, এবং বছরান্তের এই দিনে সে দূঃসহ স্মৃতিকাতর হবে।
Time is the Best Healer but where the Moments are Intolerable & Horrific, How long will you wait for the EFT (Expected Favourable Time). সুতরাং তুবা মেয়েটির জন্য আমাদের মানসিক বিভাগের সকল দরজা খোলা রইলো, তার কোন সহানুভূতিশীল পরিচিতজন এ পোস্ট দেখলে অবশ্যি আমাদের বনানী বা গুলশান সেন্টারে যোগাযোগ করবেন।
আর অভিবাসী ভাই-বোন ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য আমরা CAMMH(Centre for the Awareness of Migration Mental Health) বা ক্যামহা নামের একটি সেবাদানমূলক সংস্থা চালু করেছি, যার অস্থায়ী কার্যালয় রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত। ভূক্তভোগী অভিবাসীদের অভিযোগ,তিক্ত অভিজ্ঞতা ও সর্বোপরি তাদের যে কোন ধরনের মানসিক সমস্যার সমাধানকল্পে আমাদের মনঘর-এর পক্ষ থেকে ইহা একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ, তাদের কল্যানার্থে
আমরা ILO এবং IMO – এর সাথে সহযোগীতার মাধ্যমে কাজ করতে অত্যগ্রহী, আশা করছি অচিরেই
সকলের সহায়তায় ইহা পূর্ণরুপে আত্মপ্রকাশ করে সিয়াম-দের দুঃখ বেদনার অবসান ঘটাতে সক্ষম হবে।
